মায়া ও মমতায় ভরা একটি হৃদয়স্পর্শী কথোকথন

  

মায়া-ও-মমতায়ভরা-একটি-হৃদয়স্পর্শী-কথোকথন

- এই তোকে কতবার বলেছি ফুল চুরি করবি না। আজকেও এসেছিস? বারণ করা সত্ত্বেও  কথা কেন শুনিস না বল তো?


- ইয়ে... মানে... কাকিমা...


- ধরা পড়ে গেছিস তাই এখন আমতা আমতা করছিস। ভাগ্যিস দেখতে পেলাম। নাহলে বাগানের সব ফুলই তুলে  নিতিস। 


- না, কাকিমা আমি সব ফুল তুলি না। শুধু ওই টগর ফুল গুলোই তুলি।


- বাহ্! চুরি করে আবার বড় মুখ করে বলছিস। লজ্জাও করে না। কেমন বেহায়া মেয়ে রে তুই ? 


- কাকিমা আমি সত্যি বলছি শুধু ঐ টগর ফুল গুলোই আমার কাজে লাগে। আপনার বাগানের অন্য ফুলে আমি হাত দিই না কাকিমা। আমি মিথ্যে কথা বলছি না। বিশ্বাস করুন।


- তাহলে আমার বাগানের অন্য ফুল গুলো তাহলে কে চুরি করে? নাকি রাতারাতি ভ্যানিশ হয়ে যায় শুনি?


- তা আমি বলতে পারবো না কাকিমা। আমি প্রতিদিন ভোর ভোর করে উঠে ফুল তুলতে আসি। তখন তো দেখেছি আপনার বাগানের অন্য ফুল গুলো থাকে। ভীষণ সুন্দর সাজানো লাগে বাগান খানা।


- হ্যাঁ, ফুল তো প্রকৃতির সৌন্দর্য্য। বাগানে রঙ বেরঙের ফুল থাকলে বাগানের শোভা আরও বাড়ে। মিষ্টি গন্ধে চারদিক কি সুন্দর ভরে থাকে। আর তোরা এইসবের মর্ম বুঝিস না বল? টপাটপ করে গাছগুলোকে আঘাত করে ফুল ছিঁড়ে নিস। খুব মজা পাস তাই না? 


- কাকিমা ঐ টগর ফুল গুলো তুলতে আমারও ভীষণ মায়া হয়। ওদের কষ্টটা আমিও বুঝি। কিন্তু আমি নিরুপায়।


- মানে? তোর কথার কিছু মাথা মুন্ডু বুঝতে পারলাম না। ফুল তুলতে মায়াও হয়, কষ্ট ও হয় আবার নিরুপায় হয়ে পরের গাছের ফুল চুরি করিস। ব্যাপারটা কি? 


- আসলে কাকিমা ঐ ফুল গুলো আমি ... ঐ ফুল গুলো নিয়ে ....


- এই মেয়ে, কাঁদছিস কেন? কি হয়েছে বল? ফুল গুলো নিয়ে তুই কি করিস? 


- বিক্রি করি।


- ফুল বিক্রি করিস? কেন? 


- আমার বাবা নেই। আমাদের ছেড়ে অন্য কোথাও চলে গেছে। তিন মাস হল। বাড়িতে আমি, মা, আর আমার ছোট একটা ভাই আছে। সংসার চালানোর জন্য আমি এই কাজটা করি। এছাড়া আমার অন্য কোনো উপায় নেই কাকিমা। আমি আমার অসুস্থ মায়ের দিব্যি দিয়ে বলছি বিশ্বাস করুন আমি শুধু টগর ফুলই এখান থেকে নিতে আসি। আর কোনো ফুলে হাত দিই না।


- আহা রে! এইটুকু বয়সে এত বড় সংসারের ভার মাথায় নিয়েছিস। তুই কি আর মিথ্যে বলতে পারিস! কত বয়স রে তোর? দেখে তো মনে হচ্ছে এগারো - বারো হবে। 


- বারো বছর। 


- চোখের জল মোছ রে মা... আয় আমার ঘরে আয়।


- না না কাকিমা। আমি যাব না। আমি আর কোনদিন আপনার বাগানের ফুল চুরি করব না। কথা দিলাম। 


- ওসব কথা পরে হবে। এখন ঘরে আয়। 


- কাকিমা...


- আবার কথা... জানিস না বড়ো দের মুখের ওপর কথা বলতে নেই। যেটা বলছি শোন। ঘরে আয়। আর ফুলের ঝুড়ি টা আমার ব্যালকনির ঐ কোণ টায় রাখ। 


- কাকিমা আমার অনেকটা দেরি হয়ে গেল হাটে যেতে। তাও আপনি বলছেন তাই আপনার কথা রাখতে আসছি। 


- আয় ... আয়... বোস। ওমা! হা করে কি দেখছিস? আবার মেঝেতে বলছিস কেনো? সোফাটায় বোস।


- না না কাকিমা। আমি মেঝেতেই বসি। আমার অসুবিধা হবে না। 


- তুই তো দেখছি ভারী অবাধ্য মেয়ে। একটাও কথা শুনছিস না।


- আচ্ছা, ঠিক আছে কাকিমা আমার ভুল হয়ে গেছে । এই আমি কান মুলছি। সোফাতেই বসলাম। 


- লক্ষী মেয়ে। তুই দু মিনিট বোস। আমি এক্ষুনি আসছি। 


- এই নে... ধর।


- কি কাকিমা এটা? 


- বিশেষ কিছুই নয় রে। একটা ডিম টোস্ট করে আনলাম তোর জন্য। সাথে কয়েকটা ড্রাই ফ্রুটস।  খেয়ে নে দিখি। এখনো তো ব্রেকফাস্ট করিস নি। 


- এইসব খাবার আমি খেতে পারব না?


- কেন রে? তোর কি ডিমে এলার্জি আছে? 


- না কাকিমা। আসলে ভালো ভালো খাবার দেখলে আমার ভাইয়ের মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। 


- ওহ! তাই বুঝি তুই খেতে চাইছিস না? 

- হুম 

- কি কাণ্ড দেখো আমার! 

- কেনো? কি হয়েছে কাকিমা। 


- তোর সাথে এতক্ষন ধরে কথা বলছি কিন্তু তোর নামটাই জিজ্ঞাসা করা হয় নি।


- আমার নাম পিয়ালি মুদি। রেললাইনের ধারে যে বস্তিটা আছে ওখানে থাকি।


- আচ্ছা। তুই খেয়ে নে। বাকি কথা পরে শুনবো। তুই নিশ্চিন্তে খা। তোর ভাইয়ের জন্য আর মায়ের জন্য আমি কিছু খাবার প্যাক করে দিচ্ছি। কেমন? এবার তো একটু খুশি মনে খা। 


- সত্যিই কাকিমা খাবারটা খুব সুন্দর । কতদিন এইরকম টোস্ট খাই নি। ভাই টাও খাওয়ার জন্য বায়না করে কিনে দিতে পারি না। ফুল বিক্রির টাকায় সংসারের জিনিস কিনতেই ফুরিয়ে যায়। আজ আবার ফুল বিক্রি করতে যাওয়া হল না। অনেক ক্ষতি হয়ে গেল আমার। আর দেরিও হয়ে গেছে। এবার আমি উঠি কাকিমা।


- দাঁড়া। বলছি শুধু আমার টগর গাছের ওই কয়েকটা ফুল নিশ্চই তুই বিক্রি করিস না। আরো অনেক গাছের তুলতে হয় তাহলে কি তাই তো?


- হ্যাঁ। তাই আমায় অনেক ভোর বেলা উঠতে হয়। এই চত্বর টার আশেপাশে যত টগর ফুল ফোটে ওগুলো তুলি।  তবে সব ফুল পাই না। আমার মতো অনেকে এই কাজ করে। তারা তুলে নিয়ে যায়। আমি বেশি তাই টগর ফুলই তুলি। এই ফুল গুলো ভালো বিক্রি হয়।


- তুই শুধু ফুলই বিক্রি করিস? পড়াশোনা করিস না?


- হ্যাঁ করি তো। আমি ফাইভে পড়ি। ভোর বেলা উঠে ফুল তুলে হাটে বিক্রি করেই আমি তাড়াতাড়ি স্নান সেরে কিছু খেয়ে স্কুল চলে যাই। কাকিমা জানেন আমার ভাইটা খিচুড়ি স্কুলে পড়ে। ওদের স্কুল থেকে তো খিচুড়ি, ডিম সিদ্ধ , কলা দেয়। ও এইগুলো খুব খেতে ভালোবাসে।


- বাহ্! তোর ভাই তাহলে অ, আ, ক, খ শিখে গেছে তাহলে?


- হ্যাঁ কাকিমা শিখেছে তো। আমি ও ওকে রোজ সন্ধ্যে বেলা একটু পড়াই। ও কিন্তু খুব পড়তে ভালোবাসে। 


- আর তুই পড়তে ভালোবাসিস না?


- হ্যাঁ, ভালোবাসি তো। 


- তোর টিউশন টিচার নেই তো?


- না কাকিমা।

- তুই আমার কাছে পড়বি? কি রে?


- কিন্তু মাইনে তো দিতে পারব না।


- দিতে হবে না। তাহলে আজ থেকেই তোকে আর তোর ভাই কে আমি পড়াবো কেমন?  বিকেলে তাহলে ভাইকে নিয়ে চলে আসিস। কিরে আসবি তো?


- হ্যাঁ অবশ্যই আসবো কাকিমা। আপনি খুব ভালো কাকিমা। এখন তাহলে আমি আসি। আমার সত্যিই অনেক দেরি হয়ে গেল। মা চিন্তা করবে বাড়িতে।


- শোন, তুই রোজ কত টাকার ফুল বিক্রি করিস?

- মোটামুটি একশ টাকার মতো। আবার ভাগ্য ভালো থাকলে দেড়শ টাকাও হয়ে যায়। ওইদিন ভাইয়ের আবদার মেটাতে বাড়িতে মাছ ও রান্না হয় সেদিন। কিন্তু আজ তো কিছুই হল না। তবু একদিক থেকে ভালো আপনার দেওয়া খাবার গুলো মা, আর ভাইকে গিয়ে দেব। ওনারা নিশ্চই খুশি হবেন। 


- তুই এই দেড়শ টাকাটা রাখ।


- এ বাবা! তাই হয় নাকি। আমি শুধু শুধু আপনার থেকে টাকা নিতে পারব না কাকিমা। আপনি এটা নিজের কাছে রেখে দিন। 


- কথার অবাধ্য হতে নেই। তোর আজকের জমানো ফুল গুলো আমায় দে। পরিবর্তে আমি দেড়শত টাকা দিচ্ছি।


- কিন্তু আমার আজ অত গুলো টাকার ফুল নেই। 


- ঠিক আছে। আমি তোকে খুশি হয়ে কিছু টাকা এক্সট্রাই দিলাম। তুই তো আমায় কাকিমা বলে ডেকেছিস। আর কাকিমা রা জানিস তো মায়ের সমান হয়। টাকাটা তুই রাখ। আর হ্যাঁ তোর মা কি খুব অসুস্থ? কি হয়েছে?


- আমার মায়ের শ্বাসকষ্ট এর প্রবলেম আছে কাকিমা। ভারী কাজ করা নিষেধ। 


- আচ্ছা তোর মাকে আমি কম পরিশ্রমের কাজ দেবো। আমার একটা কাপড়ের দোকান আছে। সেখানে। খুব বেশি পরিশ্রমের কাজ নয়। তোর মা কে বলিস কিন্তু। 


- হ্যাঁ অবশ্যই বলব। অনেক হন্যে হয়েও মা কাজ তেমন খুঁজে পাচ্ছিল না। আপনি আমাদের খুব উপকার করলেন। আর আমায় তাহলে ফুল বেচতে যেতে হবে না। ঐ টাইম এ পড়াশোনা করতে পারব। 


- ঠিক বলেছিস। এবার থেকে মন দিয়ে লেখাপড়া করবি।


- আপনি আমাদের মত মানুষদের কাছে দেবীতুল্য মানুষ। আপনাকে একটা প্রণাম করি।


- আরে থাক থাক। মানুষের মতো মানুষ হও। দীর্ঘজীবী হও। আর জীবনে সফল হও। তোমার সব ইচ্ছে যেন সৃষ্টিকর্তা পূরণ করেন।


সমাপ্ত


- 










একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ